মুগ্ধতায় সাগর কন্যা কুয়াকাটা…

চর গঙ্গামতি। ঝাউ পাতায় ভোরের শিশির বিন্দু । সে বিন্দু ছড়িয়েছে ছোট্ট খেজুর গাছের পাতায়। আমাদের অবশ্য বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ নেই। আমরা তাকিয়ে আছি পূর্ব দিগন্তের অসীম সৌন্দর্য ভরা সমুদ্র জলরাশির দিকে। সে জল ভেদ করে এক সময় ধীরে ধীরে লাল থালার মত সূর্য আমাদের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে হাসল। আমরা খুশিতে লাফিয়ে উঠলাম! আগের দিনই কুয়াকাটা এসেছি কেবল সমুদ্র সৈকত থেকে এমন সূর্যোদয় দেখবো বলে। আমাদের স্বপ্নপূরণহলো! আমাদের ডেরা থেকে প্রায় একঘন্টার দূরত্বের চর গঙ্গামতি এসেছি ফজরের আযানের সঙ্গে সঙ্গে। আগের দিন মোটর সাইকেলের শামিমকে বলে রেখেছিলাম। শামিম আমাদের ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে ডেকে নিয়ে এসেছে। না হলে এই শীতে আমাদের এখানে আসাই হতো না, দেখা হতো না সূর্যোদয়!কুয়াকাটা এই উপমহাদেশের একমাত্র সমুদ্র সৈকত যেখান থেকে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দুটোই দেখা যায়। কুয়াকাটায় বাঙালি ও রাখাইন সম্প্রদায়ের বসবাস। আরকান বা বার্মা রাজ্য থেকে রাখাইন সম্প্রদায়ের আগমন সেই আঠারশ শতকে। পটুয়াখালির রাখাইন উপজাতি শীর্ষক গ্রন্থ থেকে জানা যায়, রক্ষা শব্দ থেকে রাখাইন শব্দের উৎপত্তি। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীর রাখাইন আদিবাসি বাংলাদেশে বসবাসের আগে আরাকান রাজ্যে বসবাস করতেন। খৃষ্টপূর্ব ৩৩২৫ থেকে ১৭৮৪খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত আরাকান স্বাধীন রাজ্য ছিল। আঠারশ শতকে আরাকান রাজা মহাথামাদা বর্মী রাজ বোঁধপায়ার কাছে পরাজিত হলে বর্মীরা আরাকান দখল করে। বর্মী অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য ১৫০টি রাখাইন পরিবার ৫০টি নৌকা যোগে আরাকান ত্যাগ করে পশ্চিমে যাত্রা শুরু করে। এভাবেই তারা গলাচিপা উপজেলার রাঙ্গাবালী দ্বীপে পৌঁছায় এবং প্রায় ৪৮ বছর পর কুয়াকাটা উপকূল আবিষ্কার করে এবং এখানে বসবাস শুরু করে। তখন এর নাম হয় ক্যাংছাই। যার অর্থ দাঁড়ায় ভাগ্যকূল। তাছাড়া প্রচলিত আছে যে, এখানে সমুদ্র উপকূলে মিষ্টি পানির সন্ধান পাওয়া গেলেও দূর্ভোগ ছিল ভীষণ। এখানে কুয়া কাটা হত ঠিকই, কিন্তু বালি দিয়ে তৈরি বাঁধ ভেঙ্গে যেত। তাই রাখাইনরা নিজেদের দূষতো ভাগ্য বঞ্চিত হিসাবে। রাখাইন ভাষায় যার অর্থ দাঁড়ায় ক্যাওয়েছাই। এভাবেই কুয়া কাটতে কাটতে এই উপকূল অঞ্চলের নাম হয়ে ওঠে ক্যাছাইও, যার বাংলা অর্থ কুয়াকাটা। শেষে এক সময় এলাকার নাম কুয়াকাটা হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *